সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার লায়েছ ভূইয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমোদন ছাড়া টাকা উত্তোলন, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে নেওয়া এবং অধ্যক্ষকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া, ট্রাস্টের সেক্রেটারি আলী হোসেন ও সোহেল মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. শাহীন উদ্দিন।
এ ঘটনায় সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন অধ্যক্ষ। এর আগে গত ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ব্যক্তিগত কক্ষের তালা ভেঙে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মধ্যনগর থানায়ও লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
অধ্যক্ষের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদানের পর থেকে তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছেন। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা উপজেলায় সর্বোচ্চ। ওই বছর একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ এবং দুজন জুনিয়র বৃত্তি লাভ করে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ বছর সাতজন জিপিএ-৫ এবং চারজন গোল্ডেন জিপিএ অর্জন করে।
অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও সেখানে প্রচলিত বিধিবিধান উপেক্ষা করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের মাঠে সরকারি অনুমতি ছাড়া গরুর হাট বসিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। হাটের ইজারা ও আয় থেকে প্রতিষ্ঠানের হিসাবে সামান্য টাকা জমা দেখিয়ে বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন অধ্যক্ষ।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, আলী হোসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকাকালে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অগ্রণী ব্যাংকের মোহনগঞ্জ শাখায় প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করে নিজের কলমাকান্দার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন। একই বছরের ২৯ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিল থেকে চার দফায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব অর্থ উত্তোলনে পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের অনুমোদন ছিল না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়ার বিরুদ্ধেও ২৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি একই দিনে তিন দফায় ১৫ লাখ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তারিখে আরও ৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে কমিটির অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় ভাউচার পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাঁর।
এ ছাড়া জমি ক্রয়, বিদ্যুৎ মিটার স্থাপন, ট্রাস্টের কাজে অর্থ প্রদান, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বিভিন্ন কর্মসূচির নামে টাকা নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথ ভাউচার জমা দেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব লেনদেনের মধ্যে সোহেল মিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দফায় টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ট্রাস্টের হিসাবে জমা হওয়া ১ লাখ ৮৪ হাজার ১৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন অধ্যক্ষ।
অভিযোগে সভাপতি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানের সভায় উপস্থিত না থাকলেও তাঁর অনুপস্থিতিতে ভাগ্নে আলী হোসেন স্বাক্ষর জাল করে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। অধ্যক্ষের দাবি, আর্থিক অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ আড়াল করতে তাঁর অফিসকক্ষের আলমারির তালা ভেঙে হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র, ডায়েরি, রেজুলেশন বই, এফডিআর, শিক্ষার্থীদের সনদপত্র এবং বিভিন্ন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের পাসওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে তাঁর ব্যক্তিগত আবাসিক কক্ষের তালা ভেঙে ব্যক্তিগত নথিপত্রও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
অধ্যক্ষের দাবি, তাঁকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি সংযুক্ত করে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি, তাঁর স্বজন ও শিক্ষকসমাজের কাছে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
অধ্যক্ষ মো. শাহীন উদ্দিন বলেন, “প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করেছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ জানার পর থেকেই আমাকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আমি থানায় অভিযোগ দিয়েছি। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
ট্রাস্টের সেক্রেটারি আলী হোসেন জানান, আমার নামে কোনো ব্যাংক একাউন্টেই নাই। হেডমাস্টার আর সভাপতির নামে একাউন্ট। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের কোনো ব্যাংক একাউন্ট আমার নামে নাই। তাহলে আমি টাকা কিভাবে তুলব। আগ্রনী ব্যাংকে উপবৃত্তির কিছু টাকা একবার টান্সফার হয়েছিল সেটা আমি দিয়ে দিছি। আমি টাকা না দিয়ে থাকলে অভিযোগ করবে কমিটি।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়ার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জনি রায় জানান, “অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে অভিযোগটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”