“বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি ভাবনা”
এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব
খতিব, প্রাবন্ধিক ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক
প্রতিষ্ঠাতা: মাওলানা আবদুল হাকিম (রহ.) ফাউন্ডেশন
আশাবাড়ী, শশীদল, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা।
পবিত্র ঈদুল আযহার উৎসব শেষ হয়েছে। কোরবানির পশু জবাই হয়েছে, ঈদের আনুষ্ঠানিকতাও সমাপ্ত। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য প্রকৃত প্রশ্ন হলো ঈদের পর আমাদের জীবন কতটুকু পরিবর্তিত হলো? কোরবানির শিক্ষা কি আমাদের চরিত্র, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধে প্রতিফলিত হয়েছে?
আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন:
“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ইসলামে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের পরিবর্তনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানির উদ্দেশ্য কেবল পশু জবাই নয়; বরং নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় প্রবৃত্তিকে দমন করা।
বর্তমান সমাজে আমরা উদ্বেগজনক কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব, অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ, পারিবারিক ভাঙন, মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ এবং নৈতিক অবক্ষয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাতে তথ্য পৌঁছানোর গতি বেড়েছে, কিন্তু সত্য যাচাইয়ের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন:
“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।” (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)এই আয়াত আজকের ডিজিটাল যুগে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি মিথ্যা সংবাদ, একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট বা একটি অপপ্রচার মুহূর্তেই হাজারো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই প্রচার করে।” (সহিহ মুসলিম)
আজ অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রচার, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো অথবা ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড ইসলামের শিক্ষা ও নৈতিকতার পরিপন্থী।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
“তোমরা একে অপরের গীবত করো না।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
দুঃখজনকভাবে গীবত, অপবাদ ও চরিত্রহনন এখন অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলামে একজন মুসলমানের সম্মান কাবা শরিফের মর্যাদার মতোই সম্মানিত।
ঈদের পর আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো পরিবার ও সমাজকে সুসংহত করা। বর্তমানে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বেড়ে চলেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রিজিক বৃদ্ধি ও আয়ুতে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহিহ বুখারি)
এছাড়া যুবসমাজকে ঘিরেও নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। মাদক, অনলাইন আসক্তি, অশ্লীলতা ও সহিংসতা অনেক তরুণকে বিপথগামী করছে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রাদ: ১১)
সমাজ পরিবর্তনের সূচনা ব্যক্তি থেকেই হয়। প্রত্যেক মুসলমান যদি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, সত্য কথা বলে, আমানত রক্ষা করে, প্রতিবেশীর হক আদায় করে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে, তাহলে একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
বর্তমান বিশ্বও নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এই সময়ে মুসলমানদের উচিত ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ন্যায়, সহমর্মিতা, সত্যবাদিতা ও মানবকল্যাণকে সামনে নিয়ে আসা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” (মুসনাদ আহমদ)
ঈদ শেষ হয়েছে, কিন্তু তাকওয়ার জীবন শেষ হয়নি। কোরবানির শিক্ষা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজকে নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলা এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা আজ সময়ের অন্যতম দাবি।
আসুন, আমরা নিজেদের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাই। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হোক আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও তাকওয়াভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রেরণা।
মন্তব্য করুন