০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপরাধ না করেও যেন অপরাধী ইন্জিনিয়ার হাসান শওকত

 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের অফিসকক্ষে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভিডিওটি ২০২২ সালের ২৬ মে ধারণ করা। ওই সময় হাসান শওকত ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভিডিওতে অর্থ লেনদেন করতে দেখা দুই ব্যক্তি হলেন ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ এবং মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরন। সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে যে অর্থের লেনদেন হয়েছে সেটি ছিল সরকারি একটি নির্মাণকাজের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ। ওই লেনদেনের সঙ্গে হাসান শওকতের কোনো আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল না।

জানা যায়, সরকারি বাঙলা কলেজের একটি ভবন নির্মাণের কাজ দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পায় ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।

পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি

কাজটির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৪ লাখ টাকা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপি হয়ে দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় কাজটি আটকে যায়।

কাজটি শেষ করতে পরবর্তীতে মিরন এন্টারপ্রাইজকে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় ঢালী কনস্ট্রাকশন ও মিরন এন্টারপ্রাইজের মধ্যে লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তির অংশ হিসেবেই ঢালী কনস্ট্রাকশনের জমা দেওয়া পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থের একটি অংশ পরিশোধ করা হয়।

মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরন বলেন, পারফরম্যান্স গ্যারান্টির প্রায় ২৪ লাখ টাকার মধ্যে চুক্তির দিন ৫ লাখ টাকা ঢালী কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধিকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার না করার জন্য তাদের পক্ষ থেকেই ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। তার দাবি, এ ঘটনায় কোনো ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন হয়নি। একই বক্তব্য দিয়েছেন ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, মিরন এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ তাদের প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা। দুই পক্ষের মধ্যে অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতকে সাক্ষী রাখা হয়েছিল। তার দাবি, হাসান শওকত ওই অর্থ থেকে কোনো টাকা নেননি। এ বিষয়ে হাসান শওকতও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে কাজ হস্তান্তর ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে অর্থ লেনদেনটি ছিল দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। তিনি কোনো অর্থ নেননি।

এদিকে, তার দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে পাওয়া নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর এবং ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেল থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অধীন কর্মকর্তাদের দুটো চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের স্বাক্ষর রয়েছে।

শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের বিল নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভবনটির ১০তলা ভিত্তি করা হলেও কেপিআইভুক্ত এলাকা ও বঙ্গভবনের নিরাপত্তাজনিত কারণে পরে আটতলা পর্যন্ত নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। নবম ও দশমতলার কাজের জন্য কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছেন। অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি হয়েছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হাসান শওকতকে উপস্থিত দেখা গেলেও অর্থ গ্রহণ বা অবৈধ লেনদেনে তার সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। বরং তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও তার গ্রামের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নে খোজ খবর নিয়ে জানা যায়, এলাকায় তার ও তার পরিবারের অত্যন্ত সুনাম রয়েছে। তার পিতা মরহুম আব্দুস সাত্তার মোল্যা এলাকার প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী হিসেবে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন ও পূর্বে ইউপি চেয়্যারম্যান ছিলেন। এলাকাবাসী তাদের এলাকার সন্তানের নামে এরকম ষড়যন্ত্র হওয়ার নিন্দা জানিয়েছে। এলাকার জনসাধারণ তাদের সন্তানের ব্যাপারে পূর্ণ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন। এবং হাসান শওকত যে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন সে ব্যাপারে তারা আশাবাদী।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

লেখক সম্পর্কিত তথ্য

জনপ্রিয় পোস্ট

সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে মাদক, জুয়া ও বাল্যবিয়ে রোধে কমিউনিটি পুলিশিং সভা ​অনুষ্টিত হয়েছে।

অপরাধ না করেও যেন অপরাধী ইন্জিনিয়ার হাসান শওকত

আপডেটের সময় : ১১:২৬:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের অফিসকক্ষে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভিডিওটি ২০২২ সালের ২৬ মে ধারণ করা। ওই সময় হাসান শওকত ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভিডিওতে অর্থ লেনদেন করতে দেখা দুই ব্যক্তি হলেন ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ এবং মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরন। সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে যে অর্থের লেনদেন হয়েছে সেটি ছিল সরকারি একটি নির্মাণকাজের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ। ওই লেনদেনের সঙ্গে হাসান শওকতের কোনো আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল না।

জানা যায়, সরকারি বাঙলা কলেজের একটি ভবন নির্মাণের কাজ দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পায় ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।

পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি

কাজটির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৪ লাখ টাকা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপি হয়ে দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় কাজটি আটকে যায়।

কাজটি শেষ করতে পরবর্তীতে মিরন এন্টারপ্রাইজকে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় ঢালী কনস্ট্রাকশন ও মিরন এন্টারপ্রাইজের মধ্যে লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তির অংশ হিসেবেই ঢালী কনস্ট্রাকশনের জমা দেওয়া পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থের একটি অংশ পরিশোধ করা হয়।

মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরন বলেন, পারফরম্যান্স গ্যারান্টির প্রায় ২৪ লাখ টাকার মধ্যে চুক্তির দিন ৫ লাখ টাকা ঢালী কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধিকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার না করার জন্য তাদের পক্ষ থেকেই ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। তার দাবি, এ ঘটনায় কোনো ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন হয়নি। একই বক্তব্য দিয়েছেন ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, মিরন এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ তাদের প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা। দুই পক্ষের মধ্যে অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতকে সাক্ষী রাখা হয়েছিল। তার দাবি, হাসান শওকত ওই অর্থ থেকে কোনো টাকা নেননি। এ বিষয়ে হাসান শওকতও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে কাজ হস্তান্তর ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে অর্থ লেনদেনটি ছিল দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। তিনি কোনো অর্থ নেননি।

এদিকে, তার দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে পাওয়া নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর এবং ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেল থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অধীন কর্মকর্তাদের দুটো চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের স্বাক্ষর রয়েছে।

শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের বিল নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভবনটির ১০তলা ভিত্তি করা হলেও কেপিআইভুক্ত এলাকা ও বঙ্গভবনের নিরাপত্তাজনিত কারণে পরে আটতলা পর্যন্ত নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। নবম ও দশমতলার কাজের জন্য কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছেন। অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি হয়েছে বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হাসান শওকতকে উপস্থিত দেখা গেলেও অর্থ গ্রহণ বা অবৈধ লেনদেনে তার সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। বরং তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ হস্তান্তরের সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও তার গ্রামের বাড়ি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নে খোজ খবর নিয়ে জানা যায়, এলাকায় তার ও তার পরিবারের অত্যন্ত সুনাম রয়েছে। তার পিতা মরহুম আব্দুস সাত্তার মোল্যা এলাকার প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী হিসেবে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন ও পূর্বে ইউপি চেয়্যারম্যান ছিলেন। এলাকাবাসী তাদের এলাকার সন্তানের নামে এরকম ষড়যন্ত্র হওয়ার নিন্দা জানিয়েছে। এলাকার জনসাধারণ তাদের সন্তানের ব্যাপারে পূর্ণ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন। এবং হাসান শওকত যে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন সে ব্যাপারে তারা আশাবাদী।