ভোটের সময় সবাই আসেন, উন্নয়নে কেন পিছিয়ে আকবরপুর? চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় লন্ডন প্রবাসী রফিকুল ইসলাম মিনহাজরাস্তাঘাটের উন্নয়ন, মাদক ও অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ; নিরাপদ সমাজ গড়তে পুলিশ প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা

লেখক: শেখ মোঃ আব্দুল হামিদ সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: অক্টোবর ২৭, ২০২৬


মৌলভীবাজার সদর: মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড আকবরপুরে দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনা, রাস্তাঘাটের সমস্যা, মাদকদ্রব্যের বিস্তার এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। একই সঙ্গে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশায় আলোচনায় উঠে এসেছে আকবরপুরের লন্ডন প্রবাসী রফিকুল ইসলাম মিনহাজের নাম।
গত শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮টায়, আকবরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রফিকুল ইসলাম মিনহাজ চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারলে পাঁচ বছরের জন্য লন্ডন ছেড়ে দেশে ফিরে আসবেন।
সভায় উপস্থিত অনেকেই এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা, উন্নয়নবঞ্চনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের সময় আকবরপুর কেন পিছিয়ে?
মতবিনিময় সভায় স্থানীয়দের অনেকে আকবরপুরের দীর্ঘদিনের অবহেলার অভিযোগ তুলে দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, ১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাটসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ হলেও আকবরপুর সেই তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিরা ভোট চাইতে ঘরে ঘরে আসেন এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে এলাকার উন্নয়নের বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায় না বলে তাঁদের অভিযোগ।
তাঁদের প্রশ্ন, ভোটের সময় আকবরপুরের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ হলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই এলাকাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না কেন?
এলাকাবাসীর মতে, আকবরপুরের মানুষও উন্নত রাস্তাঘাট, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাই ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকার জন্য সমান উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব।
আকবরপুর থেকে কেন চেয়ারম্যান নয়?
সভায় স্থানীয়দের আলোচনায় আরও একটি বিষয় উঠে আসে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বয়সের অনেক ব্যক্তি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের দাবি, ৯নং ওয়ার্ডের আকবরপুর থেকে এখনো কেউ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হননি।
এ বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রত্যাশা, আকবরপুর থেকেও যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসুক এবং এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও দাবি যথাযথভাবে তুলে ধরা হোক।
রফিকুল ইসলাম মিনহাজকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশা
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকে রফিকুল ইসলাম মিনহাজকে সৎ, হাফেজ, কারী ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
তাঁর সমর্থকদের প্রত্যাশা, তিনি নির্বাচিত হলে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং এলাকার রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ভূমিকা রাখবেন।
সভায় তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারলে তিনি পাঁচ বছরের জন্য লন্ডন ছেড়ে দেশে ফিরে আসবেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তিনি নির্বাচিত হলে শুধু আকবরপুর নয়, পুরো গিয়াসনগর ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন এবং সবার জন্য সমান উন্নয়নের পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করবেন।
তাঁর সমর্থকদের আশা, ভালোবাসা, সততা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এলাকার মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এসব প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা পূরণ হবে, তা নির্ভর করবে তাঁর কর্মপরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কাজের ওপর।
আকবরপুরে মাদক নিয়ে উদ্বেগ, শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
মতবিনিময় সভায় এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্থানীয়দের অনেকে।
তাঁদের অভিযোগ, আকবরপুর এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের হাতেও গাঁজার মতো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় বলে তাঁরা দাবি করেন।
এ পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, মাদক একজন ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নতুন প্রজন্মকে মাদকের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজের সচেতন মানুষ এবং প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ছুরি ও বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ, ভয়ে কথা বলতে চান না অনেকে
মাদক নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি কিছু স্থানীয় বাসিন্দা ছুরি ও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের উপস্থিতি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি বা তরুণের হাতে ছুরি ও অন্যান্য অস্ত্র থাকার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করে। এ কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে কিংবা নিজেদের উদ্বেগ জানাতে সাহস পান না বলে তাঁরা দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ আরোপ না করে প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মৌলভীবাজার পুলিশ প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা
এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার, শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা এবং ছুরি ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে মৌলভীবাজারের পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তাঁরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—ভয় নয়, নিরাপত্তা; মাদক নয়, সুস্থ ভবিষ্যৎ; অবহেলা নয়, সমান উন্নয়ন।
ভালোবাসার মাধ্যমে প্রতিটি এলাকা গড়ে তোলার প্রত্যাশা
রফিকুল ইসলাম মিনহাজকে ঘিরে স্থানীয়দের একটি বড় প্রত্যাশা হলো, তিনি যদি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, তাহলে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকাকে এগিয়ে নিতে কাজ করবেন।
তাঁর সমর্থকদের আশা, তিনি মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে ঐক্য গড়ে তুলবেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করবেন।
তাঁদের মতে, একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত পরিচয় শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝা, বিপদে পাশে থাকা, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করার মধ্যেই তাঁর সার্থকতা।
আকবরপুরের মানুষের প্রত্যাশা—উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার
স্থানীয়দের আলোচনায় উঠে আসা প্রধান দাবিগুলো হলো—
১. দীর্ঘদিনের অবহেলিত রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও সংস্কার।
২. ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকায় সমানভাবে উন্নয়নমূলক কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩. মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৪. শিশু-কিশোরদের মাদক ও অপরাধের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।
৫. অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬. অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
৭. জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
শেষ কথা: পরিবর্তন চান আকবরপুরের মানুষ
১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড আকবরপুরে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন।
একদিকে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দাবি, অন্যদিকে মাদক ও অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এলাকাবাসী একটি নিরাপদ, উন্নত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ চান।
লন্ডন প্রবাসী রফিকুল ইসলাম মিনহাজের সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঘিরে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তাঁর নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে।
আকবরপুরের মানুষের প্রশ্ন—এবার কি অবহেলার অবসান ঘটবে? মাদক ও অস্ত্রের ভয় কাটিয়ে গড়ে উঠবে কি নিরাপদ সমাজ? ভালোবাসা ও ঐক্যের মাধ্যমে কি এগিয়ে যাবে ১২নং গিয়াসনগর ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকা?
এলাকার উন্নয়ন, শান্তি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সচেতন নাগরিকদের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

শেখ মোঃ আব্দুল হামিদ সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি

শেখ মোঃ আব্দুল হামিদ সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি

শিরোনাম